শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে কর্মবান্ধব

1
801

সম্পাদকীয়:
দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটি চমকপ্রদ তথ্য সম্প্রতি আমাদের সামনে এসেছে৷ বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক আমাদের জানাচ্ছে যে বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সে হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবস্থান হতে যাচ্ছে সবার উপরে।

পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের অবস্থানও বাংলাদেশের পরে। এ তথ্যের পাশাপাশি একটি সম্পূরক তথ্যও জেনে রাখা প্রয়োজন— গত এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশে তরুণ বেকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। সঙ্গত কারণেই আমাদের সামনে প্রশ্ন— জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে যে স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়া থাকার কথা, সেটি এমন নিদারুণভাবে অনুপস্থিত কেন? স্বাভাবিক ধারণায় জিডিপি বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও বেকারত্ব হ্রাস পাওয়া উচিত। কিন্তু আদতে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে পাওয়া যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা।

বিবিএস এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৬৭ লাখ৷ এর মধ্যে কাজে নিয়োজিত আছে ৫ কোটি ৫১ লাখ। সে হিসাবে, বিবিএস এর মতে দেশে বেকারের সংখ্যা মাত্র ২৬ লাখ। তবে, বিবিএস এর এই ভাষ্যের সাথে বেশিরভাগ বিশ্লেষকই একমত নন৷ ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে বেকার (শ্রমশক্তির বাইরে) জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। বিভিন্ন গবেষণাতথ্যও অবশ্য আইএলও প্রদত্ত তথ্যকে সমর্থন করে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন ২২ লক্ষ কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে৷ কিন্তু এর মধ্যে কাজ পাচ্ছে মাত্র ৭ লক্ষ৷ বাকি ১৫ লক্ষ বেকার থেকে যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর যোগ্যতামাফিক কাজ না পাওয়া৷ দেশের উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ শিক্ষাগ্রহণ শেষে উপযুক্ত কাজে নিয়োজিত হবার সুযোগ পাচ্ছে না। আইএলও এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের সর্বোচ্চ হারের দিক থেকে বাংলাদেশ রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে৷ বাংলাদেশে এ হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।

এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের উপরে আছে কেবল পাকিস্তান৷ আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, দেশে যে জনগোষ্ঠী যত কম শিক্ষিত, তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার তত কম। তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর পার হয়নি এমন মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম, মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। যারা মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষিত, তাদের মধ্যে বেকার সাড়ে ৮ শতাংশ৷ অথচ উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ৷ সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার৷ স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো কর্মবান্ধব হয়ে ওঠেনি।

উচ্চশিক্ষিত এ জনগোষ্ঠীকে দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। যে হারে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে, সে হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে আমাদের একটি অত্যন্ত জটিল সমস্যায় নিপতিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

এসব সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে কারিগরি শিক্ষার দিকে মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক৷ উচ্চশিক্ষার সুযোগ কিছুটা সীমিত করে কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্র প্রসারিত করার মধ্য দিয়ে অধিক সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে কর্মমুখী শিক্ষার দিকে ধাবিত করতে পারলে কর্মসংস্থানের এ কৃত্রিম সংকট থেকে উত্তরণের একটি পথ তৈরি হতে পারে।

1 COMMENT

Comments are closed.