রিজেন্ট হাসপাতালের যত অপকর্ম

8
267

নিজস্ব প্রতিবেদক : রিজেন্ট হাসপাতাল করোনা টেস্টের জন্য সংগৃহীত নমুনা তিনটি প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে পরীক্ষা করাতো। সেগুলো হলো— মহাখালী ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ (জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেনটিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম) এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। কিন্তু গত ২৩ মে’র পর পাবলিক হেলথে কোনও নমুনা না পাঠিয়েও এই প্রতিষ্ঠানের নামে রোগীদেরকে করোনা টেস্টের রিপোর্ট দিয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল।

এছাড়াও এই হাসপাতালটি আইইডিসিআর ও নিপসমের প্যাড-সিল জালিয়াতি করেও রিপোর্ট দিয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব। জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন কর্মচারী অভিযোগের বিষয়ে র‌্যাবের কাছে স্বীকারও করেছেন।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের ২/এ সড়কের ১৪ নম্বর বাড়িতে রিজেন্ট হাসপাতালের প্রধান কার্যালয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো অভিযান চালায় র‌্যাবের একটি টিম। এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম।

র‌্যাবের অভিযান চলাকালে জালিয়াতির অনেক রিপোর্ট, কাগজপত্র এবং রোগীদের কাছ থেকে সংগৃহীত নমুনা রিজেন্টের ওই অফিসে দেখা গেছে। এছাড়া র‌্যাব ও রিজেন্টের কর্মকর্তারাও হাসপাতালটির বিভিন্ন অনিয়ম ও প্রতারণার কথা জানিয়েছেন।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য এই হাসপাতালের চেয়ারম্যান নিজেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এই আগ্রহের কারণে স্বাস্থ্য অধিদফতর তাকে সাধুবাদ জানিয়েছিল। সেজন্য রিজেন্ট হাসপাতালকে কোভিড চিকিৎসার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এখানে করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি করা যাবে এবং চিকিৎসার সব খরচ সরকারের।

পরীক্ষার জন্য কোনও টাকা নেওয়ারও কথা না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি পরীক্ষার জন্য টাকা নেয়। এছাড়া, তারা বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা করছে।’ র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘আমাদের কাছে রোগীরাই তাদের সন্দেহের কথা জানান। এরপর আমরাও এখানে রোগী সাজিয়ে লোক পাঠাই। তাদের কাছ থেকেও টাকা নিয়েছে। পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে। এরপর আমরা অভিযান শুরু করি। আমরা আইডিসিআর ও নিপসমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা আমাদেরকে বিভিন্ন রিপোর্ট সম্পর্কে বলেছে যে, এই রিপোর্ট তাদের না। কারণ, রিজেন্টের দেওয়া আইডি নম্বরগুলো তাদের দেওয়া আইডির সঙ্গে মিলে না।

সারোয়ার আলম বলেন, গত ২৩ মে’র পর রিজেন্ট হাসপাতাল পাবলিক হেলথে (মহাখালী ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ) কোনও নমুনা পাঠায়নি। অথচ এই প্রতিষ্ঠানের নামেও তারা রোগীদের রিপোর্ট প্রদান করেছে।

র‌্যাব জানায়, গত মার্চ মাস থেকে চার হাজার ৪২টি নমুনা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা করিয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল। এছাড়াও তারা নমুনা ‍নেওয়ার পর প্রায় ছয় হাজার জাল রিপোর্ট দিয়েছে।

এ বিষয়ে রিজেন্ট গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা মো. মইনুল হোসেন বলেন, নিপসমের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল— প্রতিদিন ৫০টি নমুনা দেওয়ার। টেকনিশিয়ানরা সেগুলো সেখানে দিতো কিনা, আমরা জানি না। আমরা তো হেড অফিসে চাকরি করি। হাসপাতালের বিষয়ে জানি না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, করোনা রোগীদের চিকিৎসা বাবদ এক কোটি ৯৬ লাখ টাকার বিল অধিদফতরে জমা দিয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল। অধিদফতর হয়ে সেই বিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রায় অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় ছিল। তবে এখনও কোনও অর্থ ছাড় হয়নি।

সারাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের নমুনা সংগ্রহের জন্য ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেই তালিকায় রিজেন্ট হাসপাতালের নাম নেই। তারপরও তারা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেছে, নগদ টাকা নিয়েছে। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, আমাদের কাছে যে তালিকা আছে, সেটি স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাওয়া। সেখানে সারাদেশে ২৫টি প্রতিষ্ঠান নমুনা সংগ্রহের জন্য অনুমোদন পেয়েছে। সেই তালিকায় রিজেন্টের নাম নেই।

নমুনা সংগ্রহ করে রিজেন্ট অফিসে রেখে দেওয়া হয়েছে এ বিষয়ে রিজেন্টের মানবসম্পদ কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘আমরা অনুমোদনের বিষয়টি জানি না। আমরা এখানে সবাই চাকরি করি। চেয়ারম্যান এবং এমডি যা বলেছেন— আমরা তাই করেছি।’

সরকারি চিকিৎসককে কাজ করতে দেয়নি রিজেন্ট
সরকারের সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (এমইউ) সই হওয়ার পর কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে একজন করে সরকারি চিকিৎসক দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে রিজেন্ট হাসপাতালেও একজন সরকারি চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ওই চিকিৎসকের নাম ডা. মো. আশরাফ। কিন্তু রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ ডা. আশরাফকে সেখানে কাজ করতে দেয়নি।

এ বিষয়ে ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, মূলত হাসপাতালে অনিয়ম করার জন্যই রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ এখানে সরকারি চিকিৎসককে দায়িত্ব পালন করতে দেয়নি। ডা. আশরাফ মাত্র ১৫ দিন এখানে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ তাকে চলে যেতে বলে। তিনি আর এখানে আসতে পারেননি।

পরীক্ষার জন্য দুই দফায় টাকা নিতো রিজেন্ট
র‌্যাব জানায়, কোভিড ১৯ ডেডিকেটেড রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেড করোনা রোগীদের নমুনা সংগ্রহের সময় প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে নিতো। অথচ কোনও ধরনের পরীক্ষা না করেই তারা রোগীদের মনগড়া রিপোর্ট দিয়ে দিতো। তারা কারোনা নেগেটিভ, কারোনা পজিটিভ রিপোর্ট দিতো। যাদের পজিটিভ রিপোর্ট দেওয়া হতো, তাদের কাছ থেকে ফের পরীক্ষার জন্য আরও এক হাজার টাকা নিয়েছে রিজেন্ট। যদিও সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী রোগীদের কাছ থেকে করোনা চিকিৎসার জন্য কোনও টাকা নেওয়ার কথা না। রোগীদের সব খরচ সরকার বহন করবে।

নমুনা ফেলে রাখা হয় অফিসে
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে করোনার সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা বাসায় গিয়ে বা হাসপাতালে বসে সংগ্রহ করতো রিজেন্ট। মঙ্গলবার উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে রিজেন্টের প্রধান কার্যালয়ে সরেজমিনে এরকম টিউববর্তী নমুনা প্যাকেটে প্যাকেটে কার্টনের ভেতরে দেখা গেছে। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হলেও সেগুলো পরীক্ষা করা হতো না। টিউবে করে এভাবে জমিয়ে রেখে কয়েকদিন পর তা ফেলে দেওয়া হতো। আর রোগীদের স্রেফ মনগড়া রিপোর্ট বানিয়ে দিতো রিজেন্ট।’

রিজেন্টের অফিসে অননুমোদিত কিট
র‌্যাবের অভিযানে রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে করোনা টেস্টের অননুমোদিত কিট পেয়েছে র‌্যাব। এই কিট বাংলাদেশে ব্যবহারের অনুমোদন নেই। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও কোনও অনুমোদন নেই। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘আমরা এখানে এমন কিট পেয়েছি, যার অনুমোদন নেই। সেই কিট তারা কেন নিয়ে এসেছিল, আমরা তা তদন্ত করবো। এসব কিট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অনুমোদন দেয়নি।’

অননুমোদিত কিটনিয়োগপ্রাপ্ত নয় এমন কর্মীদের দিয়ে জাল রিপোর্ট তৈরি করাতো রিজেন্ট
জালিয়াতির রিপোর্ট প্রস্তুত হতো রিজেন্টের উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের প্রধান কার্যালয়ে। এখানকার একটি কক্ষ ‘কন্ট্রোল রুম’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সেখানে দুটি ল্যাবটপ ও একটি ডেস্কটপ কম্পিউটারে এসব জাল রিপোর্ট তৈরি করা হতো। কম্পিউটারগুলো র‌্যাব জব্দ করেছে। এই কন্ট্রোল রুমে পাঁচ জন কাজ করতো, যারা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। এদের কেউ কেউ আবার অফিসিয়ালি নিয়োগপ্রাপ্তও না। মূলত তাদের দিয়েই জালিয়াতির কাজ করাতো রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ। পুরো বিষয়টি রিজেন্টের চেয়ারম্যান সাহেদ নিজেই ডিল করতেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব। সুমন নামে এক তরুণ যিনি এই জাল রিপোর্ট তৈরির সঙ্গে জড়িত, তিনি র‌্যাবের কাছে স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন।

ল্যাবরেটরির ফ্রিজে আইড় মাছ
দ্বিতীয় দিনের মতো মঙ্গলবার বিকালে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা শাখায় অভিযান চালায় র‌্যাব। হাসপাতালটির বিভিন্ন তলায় ঘুরে ঘুরে র‌্যাব সদস্যরা দেখতে পান— বিভিন্ন অনিয়ম আর অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। হাসপাতালটির ল্যাবরেটরিতে একটি ডিপ ফ্রিজের একাংশে পাওয়া গেছে আইড় মাছ। আরেকাংশে ছিল বিভিন্ন কেমিক্যাল। সরেজমিনে ল্যাবরেটরির ভেতরে নোংরা ও ময়লার স্তুপ দেখা গেছে।

আইসিইউ’র ভেতরে কাঁথা-বালিশ
উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালের আইসিইউ কক্ষে ছয়টি বেড রয়েছে। কক্ষের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা ছিল বিভিন্ন জিনিসপত্র। প্রতিটি বেড পর্দার কাপড় দিয়ে আলাদা আলাদা করা হয়েছে। আইসিইউ বেডের নিচে রোগীদের কাঁথা-বালিশ রাখা ছিল। ওয়ার্ডগুলোর অবস্থা ছিল আরও ভয়াবহ— নোংরা, অস্বাস্থ্যকরও গিঞ্জি।

নিয়মিত ভাড়া দেন না রিজেন্টের মালিক
উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের ২/এ সড়কের ১৪ নম্বর বাড়ির দুটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে অফিস খুলেছে রিজেন্ট গ্রুপ। তবে অভিযোগ রয়েছে, তারা নিয়মিত ভাড়া দেয় না। রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ কারও ফোনও রিসিভ করেন না। ভবনটির তৃতীয় ফ্লোরের মালিক এক নারী। ওই নারী বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। তার মা জাহানারা কবির বলেন, ‘আমার স্বামী লুৎফুল কবির পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ছিলেন। আমার মেয়েকে ১৪ নম্বর বাড়িতে একটি ইউনিট কিনে দিয়েছি। আমার মেয়ে সেটি ভাড়া দিয়েছে। কিন্তু সাহেদ নিয়মতি ভাড়া দেয় না। সে নিজেকে অনেক ক্ষমতাধর বলেও পরিচয় দেয়। দুই বছর ধরে সে ওই বাড়িতে আছে। আমরা তাকে তিন বার নোটিশ দিয়েছি, তারপরও বাড়ি ছাড়ে না। ভাড়াও দেয় না।

স্টাফদের নিয়মিত বেতন না দেওয়ার অভিযোগ
রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা মো. মইনুল হোসেন বলেন, আমি এই অফিসে আট মাস ধরে চাকরি করছি। বেতন পেয়েছি দুই মাসের। বাকি মাসের বেতন পাইনি। বেতন দেবে দেবে বলে আমাদের ঘুরায়।

রিজেন্ট হাসপাতাল ও অফিস সিলগালা ও চেয়ারম্যানসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা
রিজেন্ট হাসপাতাল ও অফিস সিলগালা করে গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের মামলা করেছে র‌্যাব। মামলায় এখনও পর্যন্ত ৮ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তবে পলাতক রয়েছে রিজেন্টের চেয়ারম্যান মো. সাহেদসহ বাকিরা।

8 COMMENTS

  1. Magnificent items from you, man. I’ve be mindful your stuff prior to and you’re just extremely excellent.
    I really like what you have obtained right here, certainly like what
    you are saying and the best way wherein you are saying it.
    You’re making it entertaining and you still take care of to stay it wise.
    I can not wait to learn far more from you. That is actually a tremendous web site.

Comments are closed.