কমরেড সিরাজ সিকদার (ছবি : সংগৃহীত)
নিজস্ব প্রতিবেদক : মাওবাদী নেতা কমরেড সিরাজ সিকদারের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বাংলাদেশের একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা ছিলেন। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি তিনি সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন—যার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে পূর্ববাংলাকে মুক্ত করে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা, সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ অভিমুখে যাত্রা করবার লক্ষ্যে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা করা। সিরাজ সিকদার গ্রেফতার হন ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি এবং পরদিন ২ জানুয়ারি গভীর রাতে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর পর ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুন এই বিষয়ে আদালতে মামলা করা হয়। সেই মামলা এখনো বিচারাধীন।
তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৩১ বছর। অল্প বয়সে সম্ভাবনাময় এ নেতার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্ককর অধ্যায়ের সূচনা হয়। সিরাজ সিকদারের মৃত্যু— দেশে ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছে। তার মহান আত্মত্যাগ কোনোভাবেই ভোলার নয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সিরাজ সিকদার ছিলেন অকুতোভয় এক মুক্তিযোদ্ধা। বুদ্ধিদীপ্ত এ গেরিলা যোদ্ধার অসাধারণ ভূমিকা তাকে অমর ও অনুসরণীয় করে রেখেছে। বিপ্লবপাগল এ বীর গেরিলা যেমন যুদ্ধের মাঠে ছিলেন ভয়হীন, তেমনি রাজনৈতিক তত্ত্ব অধ্যয়ন-গবেষণা পরিচালনা করা, শ্রমিক-কৃষকের মাঝে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলা এবং তাতে নেতৃত্ব দেয়া খুব অল্প বয়সেই তিনি রপ্ত করেছিলেন।
তুরস্কের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মহান ইব্রাহিম কাইপাকায়া, পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা জোসে কার্লোস ম্যারিয়েতে গুই— এমন দুই ক্ষণজন্মা নেতা এবং ভারতের নকশাল নেতা শহীদ কমরেড চারু মজুমদারের সঙ্গে সিরাজ সিকদারের নাম বিশ্বকমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এদের অবদান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এ মহান নেতা জন্মেছিলেন এক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ও সরকারি চাকরিজীবী পরিবারে। দিনটি ছিল ১৯৪৪ সালের ২৭ অক্টোবর। তার শিক্ষাজীবনও ছিল উজ্জ্বল। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন। পরে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। এখানেও তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
গত শতাব্দীর মধ্যভাগে বিশেষত ষাটের দশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাল সময়ে তিনি এ দেশের প্রধানতম প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন— ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম সহসভাপতি ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির পর অল্প কিছুদিন চাকরিজীবনে জড়িত ছিলেন। তবে অচিরেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যময় চাকরিজীবন পরিত্যাগ করেন এবং রাজনীতিতে সার্বক্ষণিকভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। প্রাথমিকভাবে ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) মাধ্যমে এ দেশের আদি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মতাদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে তিনি দ্রুতই তা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেন।
চীনের সমাজতান্ত্রিক সমাজে অব্যাহত সংগ্রামের উল্লম্ফন, মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঢেউ তাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু ষাটের দশকের মধ্যভাগে সোভিয়েত ইউনিয়ন রাশিয়ায় সংশোধনবাদী ক্রুশ্চভ ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াকে পুঁজিবাদে অধঃপতিত করলে প্রথমে লেবার পার্টি অব আলবেনিয়ার শীর্ষ নেতা আনোয়ার হোজা এর বিরোধিতা করেন এবং চীনা পার্টি মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে ক্রুশ্চভের বিরুদ্ধে মতাদর্শিক সংগ্রাম শুরু হলে বিশ্বসমাজতান্ত্রিক শিবির বিভক্ত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সিরাজ সিকদার মাও সে তুংয়ের আদর্শের সৈনিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন।
কমিউনিস্ট বিপ্লবের মহান লক্ষ্যে ১৯৬৭ সালে ঢাকার মালিবাগে তিনি ‘মাও সে তুং চিন্তাধারা গবেষণাগার’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর কিছুদিন পর মাও সে তুং চিন্তাধারা অনুসারী একটি নতুন ধরনের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন’। সময়টা ছিল ১৯৬৮ সালের ৮ জানুয়ারি। এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও বিপ্লবের প্রস্তুতিমূলক সংগঠন। এ প্রস্তুতি সংগঠনের মাধ্যমে তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের সূচনা করেন। ১৯৭০ সালের ৫ মে ঢাকাস্থ তত্কালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘পাকিস্তান কাউন্সিল’-এ বোমা হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে তিনি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে পাক বাহিনীর আকস্মিক আক্রমণের পরই তিনি ঢাকা ত্যাগ করে বরিশালে চলে যান এবং পেয়ারা বাগান এলাকায় মহান মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা ঘাঁটি গড়ে তোলেন। অবিলম্বেই তিনি তার সংগঠন পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনকে ’৭১ সালের ৩ জুন ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’তে রূপ দেন এবং পার্টির নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করেন। পার্টির গাইডলাইন হিসেবে তিনি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (তখনকার মতে মাও সে তুং চিন্তাধারা) গ্রহণ করেন।










Comments are closed.