এক সাহসী তরুণ মুক্তিযোদ্ধার গল্প

0
471

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিবেদন : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম মোহাম্মদ হামিদুর রহমান। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যিনি নিজের চরম সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। আর তাইতো অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীরশ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভূষিত করা হয় তিনি তাদেরই একজন।

আজ এই মহান বীরশ্রেষ্ঠের জন্মদিন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশকে স্বাধীন করার জন্য লড়াই করে শহীদ হয়েছেন তিনি। বীরশ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত সাতজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।

১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তদানিন্তন যশোর জেলার (বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলা) মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ হামিদুর রহমান। শৈশবে তিনি খালিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পরবর্তীকালে স্থানীয় নাইট স্কুলে সামান্য লেখাপড়া করেন।

১৯৭০ সালে হামিদুর রহমান সেনাবাহিনীতে সিপাহী পদে যোগ দেন। তার প্রথম ও শেষ ইউনিট ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। সেনাবাহিনীতে ভর্তির পরই তাকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে। ২৫ মার্চের রাতে চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেখানকার আরও কয়েকটি ইউনিটের সমন্বয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়।

১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে চাকরীস্থল থেকে নিজের গ্রামে ফিরে আসেন হামিদুর রহমান। একদিন পরেই সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গল থানার ধলই চা বাগানের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ধলই বর্ডার আউটপোস্টে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে।
৪ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন হামিদুর রহমান। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি ১ম ইস্টবেঙ্গলের সি কোম্পানির হয়ে ধলই সীমান্তের ফাঁড়ি দখল করার অভিযানে অংশ নেন। ভোর চারটায় মুক্তিবাহিনী লক্ষ্যস্থলের কাছে পৌঁছে অবস্থান নেয়। সামনে দু প্লাটুন ও পেছনে এক প্লাটুন সৈন্য অবস্থান নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে শত্রু অভিমুখে।

শত্রুরা যখন অবস্থানের কাছাকাছি আসে তখন একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। এসময় মুক্তিবাহিনী সীমান্ত ফাঁড়ির খুব কাছে পৌছালেও ফাঁড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত হতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিবর্ষণের জন্য আর অগ্রসর হতে পারছিলো না।

অক্টোবরের ২৮ তারিখে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পাকিস্তান বাহিনীর ৩০এ ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্টের মধ্যে শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ। এ যুদ্ধে অংশ নেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিবাহিনী পাকিস্তান বাহিনীর মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড হামলার সিদ্ধান্ত নেয়।

এই গ্রেনেড ছোঁড়ার দায়িত্ব ছিল হামিদুর রহমানের। পাহাড়ি খালের মধ্যে দিয়ে বুকে হেঁটে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন তিনি। দুটি গ্রেনেড সফলভাবে আঘাত হানে মেশিনগান পোস্টে। তারপরই গুলিবিদ্ধ হন হামিদুর রহমান। শরীরে গুলি নিয়েই তিনি মেশিনগান পোস্টে চলে যান এবং সেখানে থাকা দুজন পাকিস্তানী সৈন্যের সঙ্গে হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু করেন।

একপর্যায়ে মেশিনগান পোস্টকে অকার্যকর করতে সক্ষম হন তিনি। এই সুযোগে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল উদ্যমে এগিয়ে যান এবং শত্রু পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে সীমানা ফাঁড়িটি দখল করতে সমর্থ হন।

কিন্তু সেই বিজয়ের স্বাদ আস্বাদন করতে পারেননি হামিদুর রহমান। ফাঁড়ি দখলের পর মুক্তিযোদ্ধারা তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেন। হামিদুর রহমানের মৃতদেহ সীমান্তের অল্প দূরে ভারতীয় ভূখন্ডে ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।

নিচু স্থানে অবস্থিত হওয়ায় কবরটি এক সময় পানির তলায় তলিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালের ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার হামিদুর রহমানের দেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়।

২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ গ্রহণ করে, এবং যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে শহীদের দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক বীরশ্রেষ্ঠ পদক দেয়া হয় সিপাহী হামিদুর রহমানকে। এছাড়া তাঁর নিজের গ্রাম ‘খোর্দ খালিশপুর’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় হামিদনগর।