ছোট কাঁধে বড় দায়িত্ব

0
678

নিজস্ব প্রতিবেদক : আগারগাঁও প্রধান সড়ক থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দিকে যাওয়ার রাস্তায় রাখা পাইপের উপর বসে আছে আনুমানিক ১২ বছরের একটি শিশু, নাম মুন্না। তার পাশেই নিচে বসে বস্তায় প্লাস্টিকের বোতলগুলো গুছিয়ে রাখছিল বন্ধু রতন। তারও বয়স ১১ বছরের মতোই হবে।

পাশ দিয়ে কর্মব্যস্ত অসংখ্য মানুষের হেঁটে চলা। কিন্তু সেদিকে তাদের খেয়াল নেই, আপন মনে নিজেদের মধ্যে গল্প করছিল তারা। কিন্তু তাদের গল্পের বিষয় শুনে থমকে দাঁড়িয়ে যেতে হল। কিছুটা বিস্ময় আর আগ্রহ নিয়ে শুনছিলেন অনেকেই।

এ সময় রতনকে মুন্না বলছিল ‘আগামী মাসে খরচ একটু বেশি হবে, বাসা ভাড়াসহ আরও বেশ কিছু খরচ আছে।’ রতনও মুন্নার কথার সঙ্গে সায় দিয়ে বলে ‘আমারও দাদিকে টাকা দেয়া লাগবে’। বয়সের তুলনায় তাদের আলোচনায় ভারটা ছিল অবাক করার মতই। দুই শিশুর এমন কঠিন আলোচনা শুনে অনেকটা আগ্রহ নিয়েই আলাপ হয় তাদের সঙ্গে।

মুন্না জানায়, বাবা অনেক আগেই তাদের ছেড়ে চলে গেছেন। মা বাসাবাড়িতে কাজ করেন। সে (মুন্না) আগে লেগুনার হেলপারিসহ নানা কাজ করলেও এখন সারাদিন ভাঙ্গারি জিনিস কুড়িয়ে তা কেজি দরে বিক্রি করে। সংসারের মূল খরচ তাকেই জোগাড় করতে হয়।

‘স্কুলে পড়তে চাইছিলাম কিন্তু কাজের লাইগ্যা আর পড়া হয়নি’ উল্লেখ করে মুন্না বলে, ‘এলাকার অনেক বন্ধুই পড়ালেখা করে, কিন্তু আমার সংসারে খরচ দেয়া লাগে। এ জন্য আর স্কুলে যাওয়া হয় না। প্রতিদিন সকালে বের হই, বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ভাঙ্গারি জিনিস কুড়াই এরপর দুপুরে গিয়ে আগারগাঁও সেগুলো বিক্রি করি। প্রতিদিন প্রায় ২০০ টাকা করে আয় হয়। আমি নিজে ২০/৩০ টাকা নিয়ে খরচ করি। বাকিটা মাকে দিয়ে দেই। এরপর দুপুরের খাওয়া শেষ করে আবার বের হয়ে যাই কাজে।’

‘আমি কাজ না করলে মা একা সংসার চালাতে তো পারবে না তাই কাজ করতে হয়’ উল্লেখ করে মুন্না বলে, ‘প্রতিদিন কাজ করতে কষ্ট হয়, কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। কারণ আমার বাবা নেই, আমার কাঁধেই সংসারের দায়িত্ব।’

অন্যদিকে রতনের মা মারা গেছেন, বাবাও অন্য কোথায় চলে গেছেন। সে দাদির সঙ্গে আগারগাঁওয়ের একটি বস্তিতে থাকে। তার কাঁধেও সংসারের দায়িত্ব। আলাপকালে রতন জানায়, ‘দাদির বয়স হয়েছে তারপরও বিভিন্ন বাসায় কাজ করে। আর আমি ভাঙ্গারি কুড়িয়ে বিক্রি করি। প্রতিদিন যে টাকা পাই তা দিয়ে বাজার করি আর দাদি রান্না করে। দাদি মানুষের বাসায় মাঝে মাঝে কাজ করে সেখান থেকে কিছু টাকা আসে, আর আমার আয় দিয়ে সংসার চলে। এ জন্য আমি আর স্কুলে যেতে পারি না কিন্তু আমার অন্য বন্ধুরা ঠিকই স্কুলে যায়।’

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা বয়সি শিশুরা কলকারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ঘর-বাড়িতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। শৈশবের আনন্দ, পরিবার পরিজন থেকে স্নেহ বঞ্চিত এসব শিশুদের দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই আইন লঙ্ঘন করে কাজ করানো হচ্ছে। অথচ সরকার শ্রমিক অধিকারকে সংরক্ষণের জন্য শ্রম আইন-২০০৬ (সংশোধন-২০১৩) প্রণয়ন করেছে। এ আইনের ৩৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো পেশায় বা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিশু ও কিশোরকে নিয়োগ করা যাবে না বা কাজ করতে দেওয়া যাবে না। এদের মধ্যে অনেকই জানে না মে দিবসের কথা।

১৮৮৬ সালের ১মে শ্রমিকরা দৈনিক সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্প এলাকায় ধর্মঘটের ডাক দেন। শিকাগো শহরের ৩ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ বন্ধ রাখেন এবং প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার শ্রমিক সমবেত হন ঐ শহরের ‘হে মার্কেটে’। বিক্ষোভের এক পযায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান ১০ শ্রমিক। নিমিষেই সে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। মার্কিন সরকার মেনে নেয় তাদের দাবি। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ১মে শিকাগোর শ্রমিকদের রক্তদানকে। তখন থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হতে থাকে মে দিবস।